দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত আনসার আল্লাহ বা হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য দেশটির যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের সাম্প্রতিক অভিযান তাদের বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও মোখা বন্দরনগরীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হুথিদের ওই অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সহায়তা করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা ও সেনাদের বরাতে এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির উপদেষ্টারা হুথিদের সম্মুখসারির কমান্ডারদের সঙ্গে কাজ করেছেন, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ এসব অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে মন্তব্য না করলেও হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ড সরাসরি পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরান ও হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনি গোষ্ঠীটির স্বাধীনতার বিষয়টি তুলে ধরে আসছে। যদিও দুই পক্ষের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।
আইআরজিসি হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে বছরের পর বছর ধরে তাদের দৃঢ়তার ফল এবং একটি ঐশ্বরিক বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও ইরান ও হুথিদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি আরব এবং হুথিদের যুদ্ধ অবসানে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। দীর্ঘদিনের সংঘাত সমাধানে ইরান সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
এর আগে চলতি মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর হুথিদের ইরানের প্রক্সি হিসেবে উল্লেখ করার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ইয়েমেনে সৌদি আরবের অবরোধের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তারা।
গত জুলাইয়ে একটি ইরানি যাত্রীবাহী বিমান অবরোধ ভেঙে রাজধানী সানার হুথি নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করেছিল। তবে বিমানটি অবতরণের কিছুক্ষণ আগে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকার বিমানবন্দরে হামলা চালালে সেটি হোদেইদাহতে অবতরণ করে। হুথিদের এক কর্মকর্তা বিমানটিতে আইআরজিসির সদস্য থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। ইরানও জানায়, বিমানটিতে হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল এবং ইরানে চিকিৎসা নেওয়া কয়েকজন ইয়েমেনি নাগরিক ছিলেন।
চলতি সেপ্টেম্বরে হুথিরা মোখা, ধুবাব ও মায়ুন বা পেরিম দ্বীপ দখল করে। এর ফলে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকারও সীমিত হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফাঁস হওয়া জাতিসংঘের একটি গোপন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, আইআরজিসি, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরাকি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় হুথিরা সীমিত সক্ষমতার স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে একটি শক্তিশালী সামরিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হুথি সদস্যরা ইয়েমেনের বাইরে কৌশলগত ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন এবং ভুয়া পাসপোর্টে ইরান, লেবানন ও ইরাকে যাতায়াত করছিলেন।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক ঝুঁকি গবেষক নিকোলাস ব্রামফিল্ড আল জাজিরাকে বলেন, হুথিদের ক্ষেত্রে ইরানের পরামর্শ ও রসদ সরবরাহের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইআরজিসি ও হিজবুল্লাহর সদস্যরা বহু বছর ধরে হুথিদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং ইরান এখনো তাদের অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
তবে তিনি বলেন, পশ্চিম উপকূলের অভিযানে হুথিরা নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রায় ৭৬ হাজার ইয়েমেনি যোদ্ধাকে মোতায়েন করেছিল। একই সঙ্গে হুথিদের নিজস্ব সামরিক শিল্প সক্ষমতা গড়ে ওঠারও ক্রমবর্ধমান প্রমাণ রয়েছে।
বর্তমানে ইয়েমেনে তাইজ ও লাহিজের আশপাশের কৌশলগত উঁচু এলাকাগুলোতে তীব্র লড়াই চলছে। হুথিরা সাম্প্রতিক সাফল্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরকারি বাহিনী হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। সরকারি বাহিনী এখন তুলনামূলক সুবিধাজনক পার্বত্য এলাকায় অবস্থান করছে এবং তাদের আকাশপথে সহায়তাও রয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরে হুথিরা যে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তা পুনরাবৃত্তি করা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল দখলের পর হুথিরা বলেছে, লোহিত সাগরের বাণিজ্য ব্যাহত করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, তাঁর প্রশাসন হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনকে লক্ষ্য না করার বিষয়ে তাদের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছে। এমন সময় এ বক্তব্য এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে ইয়েমেনে যুদ্ধ পুনরায় তীব্র হওয়ার পর হুথিরা সৌদি আরবের কয়েকটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের একাধিক শহরেও হামলা হয়েছে। সৌদি সরকারের অভিযোগ, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে বিঘ্ন সৃষ্টির পেছনেও হুথিদের ভূমিকা রয়েছে।
তবে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কার দিকে একটি ড্রোন উৎক্ষেপণের সঙ্গে হুথিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুথি ও ইরান উভয় পক্ষই।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, মক্কা ও মদিনার মতো মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোর জন্য যেকোনো হুমকি এমন একটি সীমারেখা, যা কখনো অতিক্রম করা উচিত নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা পাকিস্তান ও তুরস্ক এখন পর্যন্ত হুথিদের হামলার মুখে সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি।
এদিকে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সময়ে পাকিস্তান, কাতার, ওমান ও তুরস্কের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলছে।
নিকোলাস ব্রামফিল্ড বলেন, হুথিদের ইরানের খুব ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বর্ণনা করা যায়। তাঁর মতে, দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক রয়েছে এবং কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে তাদের স্বার্থের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ খুব কমই দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বীকার করা সৌদি আরবের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ সৌদি আরব অতীতে হুথিদের পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের হামলারও শিকার হয়েছে।
ব্রামফিল্ডের মতে, সৌদি আরবের সামনে একদিকে হুথিদের পশ্চিম উপকূলের অগ্রগতির পর কোনো সমঝোতায় যাওয়ার পথ রয়েছে, অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিকল্পও রয়েছে। তবে ইয়েমেনে সৌদি স্থলবাহিনী পাঠানো বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এবং রিয়াদ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এমন পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/